Why the Zumba Workout Is Insanely Good Exercise

এমন উদাহরণ গোটা দেশেই হয়তো খুব কম পাওয়া যাবে। ঐতিহাসিক দুই পুরুষ ও নারীর পুজো হয়ে আসছে বছরের পর বছর। জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জের শিকারপুর চা বাগানের সন্ন্যাসী মন্দিরে হয় এই পুজো। কালীসাধক ভবানী পাঠক ও কালীভক্ত দেবী চৌধুরানি কালীপুজো করতেন বলে শিকারপুরের সন্ন্যাসী মন্দিরে কালীপুজোও হয়। কালী মন্দিরের পাশে মূল সন্ন্যাসী মন্দিরে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানির মাটির মূর্তি রয়েছে। আর রয়েছে ভবানী পাঠকের পুলিশ বেশধারী সঙ্গী রঙ্গলাল, দিবা, ভিক্ষুক, ও শেয়ালের কাঠের মূর্তি। বর্তমানে যে জায়গায় মন্দিরটি রয়েছে সেই এলাকাটি এখনও বৈকুণ্ঠপুর বনবিভাগের মধ্যে পড়ে। বৈকুন্ঠপুরের রায়কত বংশের রাজাদের সাহায্য নিয়ে সন্ন্যাসীরা দেবী চৌধুরানীর নেতৃত্বে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

বৈকুণ্ঠপুরের রাজা যোগেন্দ্রদেব রায়কতের আমলে প্যগোডার ধাঁচে তৈরি পাশের মন্দিরটি। প্রবেশদ্বারে শ্বেত পাথরের বৃষ মূর্তি ও তিনটি করে সিড়ির দু’পাশে সিমেন্টের সিংহ-মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের ভেতরে ছবিতে আঁকা রয়েছে ভবানী পাঠকের সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ও নদীতে বজরায় দেবী চৌধুরানি বসে আছেন। মন্দিরের পাশে চেমটা খাড়ি ও নীম নদীতে একসময়ে দেবী চৌধুরানির বজরা ভাসত। কালী সাধক ভবানীপাঠক ও দেবী চৌধুরানির স্মৃতি বিজড়িত শিকারপুরের কালী মন্দিরের পুজো আজও সকলের কাছে জনপ্রিয়। কালীমন্দিরে বছরে দু’বার ধুমধাম করে পুজো হয়। একবার আষাঢ় মাসে, আর একবার কার্তিক মাসে। খুব বড়ো করে না হলেও নিয়মনিষ্ঠা মানা হয় আজও। সারা বছর নিত্য পুজোর জন্য একজন রাজবংশী পুরোহিত থাকলেও আষাঢ় ও কার্তিক মাসের পুজো করেন এক ব্রাহ্মণ পুরোহিত। অধিষ্ঠিতা মায়ের শ্মশানকালী রূপ। পুজো হয় তন্ত্রমতে। কারনসুরা দিয়ে মাকে স্নান করানো হয়। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী এখনও ছাগ ও পায়রা বলির চল আছে। দীপাবলির রাতের পুজোয় দূরদূরান্ত থেকে ভক্তেরা ভিড় জমান মন্দিরে। রাতভর চলে পুজো। এলাকায় জমজমাট মেলা বসে। পুজো শেষে ভোরবেলায় মায়ের ভোগ নিয়ে সকলে ফিরে যান। প্রচলিত বিশ্বাস জলপাইগুড়ির বিভিন্ন বনাঞ্চলে এই রকম বেশ কয়েকটি কালীমন্দির রয়েছে, যা ভবানী পাঠকের তৈরি বলে জনশ্রুতি। এ রকমই এক ইতিহাসের সাক্ষী গোশালা মোড়ের এই মন্দির। প্রাচীন বটবৃক্ষ ঘেরা এই মন্দিরকে ঘিরে ছড়িয়ে আছে নানা ‘মিথ’। সময়টা সতেরশো শালের শেষ দিক (১৭৮৩)। ইংরেজদের রাজত্ব। তাদের বংশবদ দেশীয় রাজারা খাজনা আদায়ের নামে প্রজাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালাতেন। সেই সময় তাদের রক্ষক হিসেবে আবির্ভাব হয় ভবানী পাঠকের। তিনি ছিলেন একাধারে গরিবের ত্রাতা আর ইংরেজ-জমিদারদের শত্রু। তাঁর পরিচিতি ছিল ডাকাতসর্দার হিসেবে। কিন্তু সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করতেন। শোনা যায়, তিনি অত্যাচারী ইংরেজ ও দেশীয় জমিদারদের ওপর লুঠতরাজ চালিয়ে তা দীনদরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। এই সময় তাঁর ছত্রছায়ায় আশ্রয় পান অত্যাচারিত এবং শ্বশুরঘর থেকে বিতাড়িত দেবী চৌধুরানি। দু’জনে মিলে তৈরি করেন ভয়ংকর ডাকাত দল। এই দু’জন সন্ন্যাসী বিদ্রোহে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁরাই এই মন্দির তৈরি করেছিলেন বলে জনশ্রুতি। এখানে ছিল ডাকাতসর্দার ভবানী পাঠক ও তাঁর দলবলের আস্তানা। লুঠ করা মাল তাঁরা এখানেই লুকিয়ে রাখতেন। এই মন্দিরে একটি সূড়ঙ্গও রয়েছে সেই ইতিহাসের নিদর্শন হিসেবে। সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে যাতায়াত করতেন তাঁরা। ভবানী পাঠক মারা যাওয়ার পর এই দলের সর্দার হন দেবী চৌধুরানি। কালীমন্দিরের পাশেই রয়েছে প্যাগোডা ধাঁচের আরও একটি মন্দির। সারা বছর পুজো হয় এই মন্দিরেও। তবে এখানকার বিগ্রহ নিয়ে নানা মতান্তর রয়েছে। এই মন্দিরে একটি পুরুষ ও একটি নারী মুর্তি রয়েছে। পাশাপাশি বাঘ, শেয়াল ও আরও কিছু বিগ্রহ আছে। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এটি শিব-পার্বতীর মন্দির। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রধান বিগ্রহ দু’টি ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানির। এই দাবির সপক্ষে কিছু ঐতিহাসিক লিখেছেন, বৈকুন্ঠপুর রাজবংশের এক বংশধর দর্পদেব রায়কত ১৭২৮ থেকে ১৭৯৩ সাল অবধি রাজত্ব করার সময় ভবানী পাঠক নামে এক সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে আসেন। রাজা দর্পদেবের উদ্যোগেই এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। মিঃ রেমন্ড হেলাইচ পাইন নামে এক ইংরেজ স্থপতি মন্দিরটি নির্মাণ করেন। পরে ১৮৭১ সালে রাজা যোগেন্দ্রদেব রায়কতের আমলে মন্দিরটির সংস্কার করা হয়। ডাকাতসর্দার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন ভবানী পাঠক, তাঁরই সুযোগ্য শিষ্যা ছিলেন দেবী চৌধুরানি এই দুই ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়েই সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাস। যদিও ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলাদেশের রংপুরের মন্থনী রাজ এস্টেটের সর্বময় কর্ত্রী ছিলেন জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানি নামে এক তেজস্বিনী মহিলা। তাঁকেই কল্পনায় দেবী চৌধুরানি হিসাবে রূপ দিয়েছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তবে ইতিহাস যা-ই বলুক না কেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে কিন্তু ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানি দেবতাই। প্রথমে কাঠের মূর্তি তৈরি করা হলেও তা পুড়ে যাওয়ায় পরে মাটির প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানির। অন্য মুর্তিগুলি এখনও কাঠের। কাঠের তৈরি মণ্ডপটির অবস্থাও ভালো নয়। শিকারপুর চা বাগান কর্তৃপক্ষই এর দেখাশোনা করেন। সরকারি সাহায্য না পেলে প্রাচীন ইতিহাস ও স্থানীয় মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নিদর্শনটি এক সময় নষ্ট হয়ে যাবে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এখানকার বাসিন্দারা।